Friday , July 1 2022

ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ , ব্যবসায় পরিচিতি | Business Study in 2022

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আজকের এই পর্বে থাকছে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ, ব্যবসায় পরিচিতি নিয়ে বিস্তারিত। চলুন শুরু করি।

ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ , ব্যবসায় পরিচিতি

ব্যবসায় পরিচিতি – Introducing of Business

সাধারণত মুনাফা অর্জন তথা অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে মানুষ ব্যবসায় করে। কিন্তু বর্তমানে শুধুমাত্র মুনাফা অর্জনকে ব্যবসায়ের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ ব্যবসায় একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। তাই সমাজের মানুষের বৈচিত্র্যময় চাহিদা পূরণের মধ্যেই ব্যবসায়ের অস্তিত্ব নির্ভরশীল।

মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যের পাশাপাশি সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ের কতিপয় উদ্দেশ্য অর্জনের প্রচেষ্টাও থাকে। দেশ, কাল ও জাতিভেদে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যও বহুবিধ এবং বৈচিত্র্যমণ্ডিত । বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ব্যবসায়কে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই কিছু উদ্দেশ্য প্রয়োজন।

Peter F. Drucker , “Objectives are needed in every area where performance and results directly and vitally affect survival and prosperity of the business.” [‘ব্যবসায়কে উন্নতি করতে ও টিকে থাকতে হলে এর উপর প্রত্যক্ষ ও মৌলিকভাবে প্রভাব বিস্তারকারী প্রতিটি ক্ষেত্রের উদ্দেশ্য নির্ধারণ প্রয়োজন

ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ (অর্থনীতি)- Purpose of Business

ব্যবসায়ের প্রধান ৩টি উদ্দেশ্য হলো,

  1. অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য (Economic Objects),
  2. সামাজিক উদ্দেশ্য (Social Objectives) ,
  3. মানবিক উদ্দেশ্য (Human Objects),
  4. জাতীয় উদ্দেশ্য (National objectives),
  5. অন্যান্য (Others)

(ক) অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য (Economic Objects):

ব্যবসায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য ব্যবসায় করে থাকে।

ব্যবসায়ের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য নিম্নরূপ :

১। মুনাফা অর্জন (Profit) : ব্যবসায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জনের জন্যই মূলত ব্যবসায় করে থাকে।

২। উৎপাদন (Production) : ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে। এই উদ্দেশ্যে সে কাঁচামাল সংগ্রহ করে । সংগৃহীর কাঁচামাল হতে তৈরি পণ্য উৎপাদন করে, আর এই উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসায়ী মুনাফা অর্জন করে। এছাড়া ব্যবসায়ী সেবাও উৎপাদন করে। সুতরাং পণ্য ও সেবা উৎপাদন ব্যবসায়ে অন্যতম উদ্দেশ্য।

৩। সম্পদের ব্যবহার (Use of wealth): দেশে প্রচুর সম্পদ থাকে যা সাধারণত জনগণের তেমন কোনো কাজে আসে না। এই সমস্ত সম্পদের স্থানগত, কালগত, রূপগত ইত্যাদি পরিবর্তন করে অকেজো ও অবহেলিত সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কাজ করে থাকে।

৪। ক্রেতা সৃষ্টি (Buyer creation) : একজন ব্যবসায়ী পণ্যের বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে ক্রেতা সৃষ্টি করে থাকে। যার ফলে বিক্রয় বৃদ্ধি পায়। ক্রয় ও বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ তথা সকলেই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়।

৫। জনশক্তির ব্যবহার (Use of power) : ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করে। উৎপাদনের জন্য ছোট, বড় ও মাঝারি, বৃহৎ ও ভারি শিল্প স্থাপন করতে হয়। এই সকল প্রতিষ্ঠানে প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হয় এবং শ্রমের সঠিক ও বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং আর্থিক কল্যাণ ত্বরান্বিত হয়।

৬। জাতীয় আয় বৃদ্ধি (Increase of national income) : ব্যবসায়ের দ্বারা ব্যক্তি ও সমাজের আয় বৃদ্ধি পায়, এতে করে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। তাই ব্যক্তিগত ও জাতীয় আয় বৃদ্ধি করা ব্যবসায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য।

৭। বিনিয়োগ বৃদ্ধি (Increase of investment) : বিনিয়োগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। ব্যবসায়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়। জনগণের হাতে অলসভাবে পড়ে থাকা জমানো অর্থ ব্যবসায়ীরা ঋণ ও মূলধন আকারে সংগ্রহ করে অলস টাকাকে উৎপাদনকারী ও গাতশীল কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত সুবিধা অর্জন করে।

(খ) সামাজিক উদ্দেশ্য (Social Objectives) :

ব্যবসায়ের মাধ্যমে নানা প্রকার সামাজিক উদ্দেশ্য অর্জত হয়। প্রখ্যাত লেখক আর. উইক (R. Wick) ব্যবসায়ের সামাজিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— “পৃথিবীতে মানুষ একমাত্র খাওয়ার জন্য বেঁচে থাকে না। আবার শুধু মুনাফার জন্যও ব্যবসায় করে না।” (“Profit can be no more the objective of a business than eating is the objective of living.”)

১। চাহিদা পূরণ (Demand): সমাজবদ্ধ মানুষের বিচিত্র ও বহুমুখী চাহিদা থাকে। যেমন— নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা, জীবন রক্ষাকারী দ্রব্যের চাহিদা, বিলাস দ্রব্যের চাহিদা। ব্যবসায় মানুষের এই সমস্ত চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ করে।

২। কর্মসংস্থান (Employment): ব্যবসায়ের দ্বারা কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধান হয়। একক, ক্ষুদ্র, মাঝারি, বৃহৎ ও ভারী শিল্পের মাধ্যমে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং বেকারত্ব দূর হয়।

৩। উদ্ভাবন (Innovation) : ব্যবসায়ের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। ফলে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়। এই সকল নতুন পণ্য উৎপাদনের জন্য গবেষণা করা হয়। ফলে মানুষের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তির জাগরণ ঘটে। আর উদ্ভাবনী কর্ম দ্বারা সমাজ সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়।

৪। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন (Development of living standard): জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা ব্যবসায়ের আরেকটি উদ্দেশ্য। ব্যবসায় মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে। এতে সমাজে বসবাসকারী মানুষ সুন্দর ও আরামপ্রিয় জীবনযাপন করতে পারে। আয় ও ভোগের মাধ্যমে মানুষ উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পায় ।

৫। ভালো কাজে অংশগ্রহণ (Participation in good work): ব্যবসায় বলতে বৈধভাবে পণ্য উৎপাদন ও ক্রয় বিক্রয়কে বুঝায়। ব্যবসায়িক কাজে লিপ্ত থাকলে মানুষ অর্থনৈতিক কার্যাবলি যেমন- চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় না। তারা ভালো কাজে জড়িত থেকে আয়-উন্নতি করার সুযোগ পায় ।

(গ) মানবিক উদ্দেশ্য (Human Objects):

ব্যবসায়ের মানবিক উদ্দেশ্যও কম নয়। ইহা মানব সেবার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন ছাড়া আর কিছুই নয়। এর বাইরে গেলে একে অসাধু ব্যবসায় হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যবসায়ের মানবিক উদ্দেশ্যসমূহ হচ্ছে-‘

১। সঠিক পারিশ্রমিক প্রদান (Payment of lactual wages) : শ্রমিককে তার কাজের জন্য পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এই পারিশ্রমিক সঠিক ও ন্যায়ভিত্তিক হয়। ঠিকমতো মজুরি প্রদান করা না হলে শ্রমিকরা ভালোভাবে কাজ করে না। তাই ব্যবসায়ীরাও সঠিক মজুরি ও বোনাস দিয়ে শ্রমিকদেরকে কাজ করতে সাহায্য করে।

২। মানব সম্পদ উন্নয়ন (Development of human resources) : ব্যবসায়ের একটি মানবিক উদ্দেশ্য হলো মানব সম্পদ সৃষ্টি করা। ব্যবসায়িক কারণে শ্রমিক-কর্মচারীরা উৎপাদন কৌশল, আবিষ্কার কৌশল, বাজার দক্ষতা অর্জন, সময়, অর্থ ও মেধার ব্যবহার, শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা ইত্যাদি অর্জন করে। ফলে মানব সম্পদের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটে।

৩। সম্পর্ক সৃষ্টি (Relation) : ব্যবসায়িক কারণে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক, ব্যবসায়ী ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক, আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের সাথে সম্পর্ক ও মৈত্রী সৃষ্টি হয় যা মানব সম্পর্ককে উন্নত করে।

৪। শ্রমিক কল্যাণ (Workers welfare) : ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করে । তাদেরকে ন্যায্য
মজুরি দেয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের সুযোগ দেয়। ফলে শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়।

৫। চাকরির নিরাপত্তা (Ensure of works and services): ব্যবসায়ের সাফল্যের জন্য শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তা দরকার হয়। বর্তমান যুগের ব্যবসায়ীরা এই বিষয়টি ভালভাবে বোঝে। তাই পুরনো দিনের মতো শ্রমিকদেরকে কথায় কথায় চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয় না।

(ঘ). জাতীয় উদ্দেশ্য (National objectives) :

ব্যবসায়ের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। কারণ ব্যবসায়ের সাথে দেশ ও জাতীয় স্বার্থ সবচেয়ে বেশি জড়িত থাকে।
১। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব (State sovereignty) : ব্যবসায়-বাণিজ্য রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে। দেশ রক্ষার উপকরণ অর্থাৎ সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ও বিপণন করে দেশকে স্বাবলম্বী করা যায়। যুদ্ধের সময় আমদানিকৃত উপকরণের চেয়ে উৎপাদিতকরণের উপর বেশি নির্ভর করা যায়। ব্যবসায়িক কারণে এক সময় বাংলার স্বাধীনতা ব্রিটিশ বেনিয়ার কাছে ভূলুণ্ঠিত হয়।

২। রাজস্ব বৃদ্ধি (Revenue increase) : ব্যবসায়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব অর্জিত হয়। রপ্তানি ব্যবসা যত বেশি হয় তত বেশি রাজস্ব আয় বেড়ে যায় যা জাতীয় অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে।

৩। জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি (Increase of National wealth): ব্যবসায়ের মাধ্যমে সম্পদ উৎপাদন হয়। ব্যবসায়ীরা কাঁচামালকে পাকামালে রূপান্তর করে অচল পণ্যকে সচল করে গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন করে দেশের সম্পদ বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পারে।

(ঙ) অন্যান্য :

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, ব্যবসায়ের বহুমুখী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজ তথা জাতির উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেকে উন্নয়ন কর।

তাই, C. B. Gupta বলেন, “Business requires reconciliation of several micro and macro level objectives.”

আরও পড়ুন,

ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যসমূহ , ব্যবসায় পরিচিতি | Business Study in 2022

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published.